মাও সেতুং কি সত্যিই ১৯৭৬ পর্যন্ত বেঁচে ভুল করেছিলেন? একটি রটে যাওয়া উক্তি ও প্রাচীন বিশ্বের রহস্যময় দলিল

মাও সেতুং কি সত্যিই ১৯৭৬ পর্যন্ত বেঁচে ভুল করেছিলেন? একটি রটে যাওয়া উক্তি ও প্রাচীন বিশ্বের রহস্যময় দলিল · Avonetics
আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাও সেতুং এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে হাজারো বিতর্ক ও কৌতূহল। তাঁর মৃত্যুর পর কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে একটি উক্তি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলা হয়, পার্টির প্রবীণ নেতা চেন ইউন মন্তব্য করেছিলেন, মাও যদি ১৯৫৬ সালে মারা যেতেন তবে তিনি অমর নেতা থাকতেন; ১৯৬৬ সালে মারা গেলেও মহান থাকতেন; কিন্তু ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যু সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই উক্তিটিকে কেবলই একটি শহুরে রটনা বা পশ্চিমা গণমাধ্যমের চটকদার উপস্থাপন বলে মনে করা হতো। দি ইকোনমিস্ট কিংবা ব্রিটানিকার মতো বিশ্বখ্যাত প্রকাশনাগুলোতেও উক্তিটি উল্লেখ করা হলেও কোনো প্রাথমিক নথির হদিশ মেলেনি। তবে সম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, এই বক্তব্যের পেছনের ঐতিহাসিক ভিত্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
Read nextরোমান পাত্রের রাজকীয় প্রচারণা এবং রণাঙ্গনের প্রাণঘাতী পাসওয়ার্ড বিভ্রাট
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত গবেষক হ্যারি হার্ডিংয়ের গ্রন্থ অনুসরণে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ১৫ জানুয়ারি হংকংয়ের প্রভাবশালী পত্রিকা 'মিং পাও'-তে এই মন্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। এর ঠিক তিন দিন পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোরেন ব্রডকাস্ট ইনফরমেশন সার্ভিস (FBIS) এই প্রতিবেদনটি তাদের অফিসিয়াল রিপোর্টে স্থান দেয়। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, তৎকালীন বেইজিংয়ের রুদ্ধদ্বার পার্টি বৈঠকের খবর হংকংয়ের মাধ্যমে বাইরে আসা খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল।
একজন ইতিহাস গবেষকের মতে, তৎকালীন পার্টি নেতৃত্বের উদ্দেশ্য ছিল মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ভয়াবহতা শিকার করেও তাঁর মূল অবদানকে ধরে রাখা। তাই এই ধরনের সময়রেখা ভিত্তিক মূল্যায়ন পার্টির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠতেই পারে। অন্যদিকে, অপর এক গবেষক দাবি করেন, চায়না কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব আর্কাইভে এই উক্তির হুবহু কোনো অস্তিত্ব না থাকায় একে কেবলই তৎকালীন হংকং সাংবাদিকতার একটি মুখরোচক অনুবাদ হিসেবে দেখা ভালো।
ইতিহাসের এই মূল্যায়নের ধোঁয়াশা কেবল আধুনিক চীনে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বখ্যাত আমেরিকান লেখক গোর ভিডালের 'ক্রিয়েশন' উপন্যাসেও এমন সত্য ও মিথ্যার টানাপোড়েন চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাসে পারস্যের কূটনীতিক সাইরাস স্পিটামার চোখ দিয়ে বিশ্ব সভ্যতার গতিপথ দেখানো হয়েছে। সাইরাস একই সাথে বুদ্ধ, কনফুসিয়াস এবং সক্রেটিসের যুগে গিয়ে পৌঁছান এবং দেখতে পান কীভাবে ইতিহাস তৈরি ও বিকৃত হয়।
ইতিহাস কি কেবলই বিজয়ীদের লেখা একপাক্ষিক দলিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে থাকে অচেনা কোনো গল্প? আধুনিক চীনের গোপন রাজনৈতিক তথ্য থেকে শুরু করে প্রাচীন বিশ্বের এই মহান ঐতিহাসিক যাত্রা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন 'কালের ক্যানভাস' পডকাস্টের সঞ্চালকরা।